হরমুজে নতুন সংকট

আটকে থাকা জাহাজে জমেছে সামুদ্রিক জীবের লাখো বর্গফুটের আস্তরণ

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবিরতির পরও বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি তেল সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কমে গেছে।

প্রণালিতে কয়েক মাস ধরে আটকে থাকা শত শত তেলবাহী জাহাজে দেখা দিয়েছে নতুন ধরনের জটিলতা। নৌযানগুলোর তলদেশে জমেছে বিপুল পরিমাণ সামুদ্রিক জীব ও শৈবাল। এসব জাহাজ বাণিজ্যিকভাবে পরিচালনার উপযোগী করতে ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ পরিষ্কার কার্যক্রম প্রয়োজন বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে সিএনএন।

শিপিং খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রায় চার মাস ধরে নোঙরে থাকা ট্যাংকারে সামুদ্রিক জীবের আস্তরণ তৈরি হয়েছে। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হতে আরো সময় লাগতে পারে ও জ্বালানি তেল পরিবহনের ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে।

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডর। বৈশ্বিক সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বড় একটি অংশ এ প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করে। সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে কয়েক মাস ধরে শত শত তেলবাহী জাহাজ পারস্য উপসাগরে নোঙর করে ছিল। ফলে নতুন এক অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে আন্তর্জাতিক শিপিং খাত।

বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, দীর্ঘ সময় সমুদ্রে স্থির অবস্থায় থাকায় জাহাজগুলোর তলদেশে বার্নাকল, ঝিনুক, শামুক, শৈবালসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণী ও উদ্ভিদের আস্তরণ তৈরি হয়েছে। সামুদ্রিক শিল্পে এ সমস্যাকে বলা হয় ‘বায়োফাউলিং’।

শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বায়োফাউলিং শুধু রক্ষণাবেক্ষণের সমস্যা নয়; এটি সরাসরি জাহাজ পরিচালনার ব্যয়, জ্বালানি ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, আধুনিক একটি সুপারট্যাংকারের দৈর্ঘ্য এক হাজার ফুটেরও বেশি হতে পারে। এর তলদেশের আয়তন প্রায় দেড় লাখ বর্গফুট পর্যন্ত হয়। বিশাল এ এলাকা পরিষ্কার করতে বিশেষজ্ঞ ডুবুরি দলের ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। বর্তমানে হরমুজ অঞ্চলে অপেক্ষমাণ ৬০০-এর বেশি জাহাজে পরিষ্কার কার্যক্রম পরিচালনা করা একটি বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাহাজের তলদেশ পরিষ্কারকারী দলগুলোর চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় তারা পারিশ্রমিক কয়েক হাজার ডলার পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছে।

জাহাজ পরিচালকদের আন্তর্জাতিক সংস্থা বিমকোর প্রধান পরিবেশ কর্মকর্তা অ্যারন সোরেনসেন জানান, তারা এখন প্রতিটি জাহাজের জন্য ১০ হাজার ডলার বা তার বেশি অর্থ দাবি করছে। তবে এ ব্যয় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ জাহাজের তলদেশে সামুদ্রিক জীব জমে গেলে একই দূরত্ব অতিক্রম করতে কয়েক গুণ জ্বালানি প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে এশিয়া, ইউরোপ বা অস্ট্রেলিয়ার দীর্ঘ দূরত্বের জ্বালানি তেল পরিবহনে এর প্রভাব আরো বেশি পড়তে পারে।

লয়েডস মার্কেট অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, একটি জাহাজ পরিচালনার মোট খরচের প্রায় অর্ধেকই জ্বালানি ব্যয়। ফলে বায়োফাউলিংয়ের কারণে জ্বালানি দক্ষতা কমে গেলে শিপিং কোম্পানির পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ চেইন ও বাজারমূল্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা আরো জানান, দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করলে জাহাজের প্রপেলার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে প্রপেলার খুলে আলাদাভাবে পরিষ্কার করতে হয়। এছাড়া সামুদ্রিক জীব জাহাজের কুলিং সিস্টেমেও প্রবেশ করতে পারে, যা প্রযুক্তিগত ত্রুটির ঝুঁকি বাড়ায়।

এছাড়া আন্তর্জাতিক পরিবেশবিষয়ক বিধিনিষেধ এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিভিন্ন দেশের বন্দর কর্তৃপক্ষ ও আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থাগুলো বিদেশী সামুদ্রিক প্রাণীর বিস্তার ঠেকাতে কঠোর নিয়ম অনুসরণ করে। ফলে বায়োফাউলিং অপসারণ ছাড়া অধিকাংশ জাহাজের পক্ষে আন্তর্জাতিক বন্দরগুলোয় প্রবেশ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু হওয়ার পরও বৈশ্বিক জ্বালানি তেল সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হওয়ার এটি অন্যতম কারণ। জাহাজ পরিষ্কারের পাশাপাশি মাইন অপসারণ, নিরাপত্তা যাচাই, বীমা অনুমোদন ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মতিসহ আরো কয়েকটি ধাপ সম্পন্ন করতে হবে।

ইরান এরই মধ্যে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন করে নিবন্ধন করতে হবে। অন্যদিকে যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়েও বাজারে অনিশ্চয়তা রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক তেলবাজারে সরবরাহ পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরো সময় লাগবে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।

তাদের মতে, হরমুজ প্রণালি খুলে দিলেও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার তাৎক্ষণিকভাবে আগের অবস্থায় ফিরবে না। বরং যুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতায় সরবরাহ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া ধীর ও ব্যয়বহুল হতে পারে। আর সে প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ শুরু তেলবাহী জাহাজের তলদেশে জমে থাকা সামুদ্রিক জীব পরিষ্কার করার কাজ দিয়ে।

ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের তথ্যানুযায়ী, ইরান যুদ্ধ শুরুর পর প্রথম ১০০ দিনে হরমুজে ১ হাজার ২০০টির বেশি পণ্যবাহী জাহাজ আটকে ছিল। এসব জাহাজে থাকা পণ্যের মোট মূল্য প্রায় ১২৫ বিলিয়ন বা ১২ হাজার ৫০০ কোটি ডলার। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু জাহাজ চলাচল শুরু করলেও পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।

আরও